সম্ভাবনাময় আইসিটি খাতে ৫ বছরে কর্মসংস্থান হবে ২০ লাখ

Posted October 31, 2016 by Rifatul Islam


গ্লোবাল ব্র্যান্ড দেশের সবচেয়ে বড় আইসিটি কোম্পানি। এইচপি, ডেল, লেনোভোসহ বিশ্বের ৫২টি ব্র্যান্ডের আইসিটি পণ্য বাজারজাত করছে এই কোম্পানি। কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আনোয়ার। পড়াশোনা শেষে ১৯৯১ সালে রপ্তানিমুখী গার্মেন্টসের ব্যবসা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। ১৯৯৬ সালে শুরু করেন আইসিটি খাতের ব্যবসা। হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের পাশাপাশি বিভিন্ন সলিউশন দিচ্ছে গ্লোবাল ব্র্যান্ড। বাংলাদেশে আইটি খাতের সম্ভাবনা ও বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে তার সঙ্গে আলাপচারিতায়।

 

অর্থসূচক: গ্লোবাল ব্র্যান্ডের যাত্রা শুরু হয় কবে?

রফিকুল আনোয়ার: ১৯৯৬ সালে গ্লোবাল ব্র্যান্ডের যাত্রা। নব্বইয়ের দশকে আইটি এবং এর সঙ্গে সম্পৃক্ত পণ্য ব্যক্তি উদ্যোগে বিদেশ থেকে আনা হতো। তখন আমরা চিন্তা করলাম, এই খাতে বিপ্লব হতে পারে। শিক্ষিত ও তরুণ জনগোষ্ঠীর বিষয় মাথায় রেখে এ ব্যবসায় যুক্ত হই। সে সময়ে সিঙ্গাপুর বা হংকং থেকে কম্পিউটার ও এক্সেসরিজসহ তথ্য প্রযুক্তির (আইসিটি) পণ্য আমদানি করা হতো। তখন এ ব্যবসা ভিন্নভাবে করার চিন্তা করলাম। তৃতীয় পক্ষ নয়; সরাসরি কম্পিউটার ম্যানুফেকচারারদের কাছ থেকে পণ্য আমদানির চিন্তা করলাম। ডেল, এইচপি, লেনোভো, আসুস, এলজি, তোশিবা ইত্যাদি ব্র্যান্ডের পণ্য উৎপাদকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ শুরু করি। ধীরে ধীরে সাড়াও পাই।

rafiqul-anwar
 

অর্থসূচক: কোন কোম্পানির ডিস্ট্রিবিউটরশিপের মাধ্যমে গ্লোবালের যাত্রা শুরু হয়?

রফিকুল আনোয়ার: এলজির এক্সক্লুসিভ ডিস্টিবিউটরশিপের মাধ্যমে গ্লোবাল ব্র্যান্ডের যাত্রা শুরু। ১৯৯৭ সালে দ্বিতীয় ডিস্ট্রিবিউটরশিপ তাইওয়ানের ব্র্যান্ড আসুসের। ১৯৯৬ থেকে ২০১৬ প্রায় ২০ বছরে একনিষ্ঠভাবে আইটি খাতের সব ধরনের পণ্য সারাদেশে ২৫টি শাখা ও ৭৫০ জন ডিলারের মাধ্যমে বাজারজাত করছি। ডিলারের মাধ্যমে বিতরণের পাশাপাশি ঢাকা ও ঢাকার বাইরের শাখাগুলোর মাধ্যমে ক্রেতাদের হাতে পণ্য তুলে দিচ্ছি।

অর্থসূচক: বর্তমানে কতটি কোম্পানির পণ্য গ্লোবাল ব্র্যান্ড বাজারজাত করছে?

রফিকুল আনোয়ার: বর্তমানে আমরা ৫২টি কোম্পানির পণ্য বাজারজাত করছি। পোর্টফোলিওর দিক থেকে আমরা বাংলাদেশে সবচেয়ে বড়। আমাদের মতো এতগুলো ব্র্যান্ড আর কারো নেই। আমরা খুব নিষ্ঠার সঙ্গে, যুগোপযোগী আমাদের রিসার্চ ও ব্যাক অফিসের মাধ্যমে কোথায়, কখন, কী ধরনের পণ্য আসছে বা আগামীতে কার কী প্ল্যান আছে সেগুলো নিয়ে কাজ করি। এর ভিত্তিতে আমরা পরিকল্পনা সাজাই। তাইওয়ান বা জাপানে আইসিটির নতুন কোনো পণ্য বের হলে সর্বোচ্চ ৭ দিনের মধ্যে সেটি বাংলাদেশের মানুষের কাছে আনছি আমরা।

অর্থসূচক: গ্লোবাল ব্র্যান্ড প্রায় ৫২টি কোম্পানির পণ্য বাজারজাত করছে। এর মধ্যে শীর্ষ ১০ ব্র্যান্ড কারা এবং কী কী ডিভাইস আছে এর মধ্যে?

রফিকুল আনোয়ার: ডেক্সটপ, ল্যাপটপ, ট্যাব, মোবাইল থেকে শুরু করে আইসিটির সব ধরনের পণ্য আমারা বিপণন করছি। প্রথম ১০টি ব্র্যান্ডের মধ্যে আছে আসুস, লেনোভা, ডেল, হিটাচি, এলজি, তোশিবা।

rafiqul-anwar2
 

অর্থসূচক: আইসিটির মার্কেটের আকার কত বড় এবং গ্লোবাল ব্র্যান্ডের শেয়ার কতটুকু?

রফিকুল আনোয়ার: বর্তমানে আইসিটির বাজার ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকার। এখানে গ্লোবাল ব্র্যান্ডের অংশ ৮০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকা।

অর্থসূচক: আইসিটি পণ্যের বাজার কী হারে বাড়ছে?

রফিকুল আনোয়ার: আইসিটি পণ্যের বাজারে প্রবৃদ্ধির হার ২০ শতাংশের বেশি। বর্তমান সরকার ডিজিটালাইজেশনের যে রূপরেখা তৈরি করেছে, তার বাস্তব রূপ নিলে প্রবৃদ্ধি ৭৫ শতাংশ থেকে ১০০  শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সব মন্ত্রণালয়, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ল্যাব করা হচ্ছে; প্রজেক্টর ও ল্যাপটপ দিচ্ছে; প্রতিবছর এখানে লাখ লাখ প্রজেক্টর দিচ্ছে, ল্যাপটপ, প্রিন্টার যাচ্ছে। এই ধারা আরও কয়েক বছর অব্যাহত থাকবে।

অর্থসূচক: আমাদের মার্কেট সাইজ অনেক বড় হচ্ছে। তো এই অবস্থায় এখানে পণ্য উৎপাদন বা সংযোজন শিল্পের সম্ভাবনা কতটুকু? এ বিষয়ে আপনাদের কোনো ভাবনা আছি কী?

রফিকুল আনোয়ার: আমরা আইসিটির যে পণ্যগুলো আমদানি করি বা সারাবিশ্বে যে পণ্যগুলো ব্যবহার হয়- তার শতকরা ৯০ শতাংশই চীন বা তাইওয়ানে উৎপাদন হচ্ছে। একটি ল্যাপটপ বানানোর জন্য কয়েকশ কম্পোনেন্ট প্রয়োজন হয়। তাই এখানে ল্যাপটপ জাতীয় পণ্য উৎপাদন সহজ নয়; এটি লাভজনক হবে না। তবে সংযোজনের সুযোগ আছে। এর জন্য ব্যাক টু ব্যাক এলসি সুবিধাসহ কিছু ইনসেনটিভ প্রয়োজন। আমাদের প্রতিবেশি দেশ ভারত সফটওয়্যারে বিশ্বে নেতৃত্ব দিলেও আইটি পণ্য উৎপাদনে কোনো সফলতা অর্জন করতে পারেনি।

rafiqul-anwar3
 

অর্থসূচক: গ্লোবাল ব্র্যান্ড কোন ধরনের কোম্পানি?

রফিকুল আনোয়ার: গ্লোবাল ব্র্যান্ড মূলত হার্ডওয়ার কেন্দ্রীক। মোট টার্নওভারের ৯০ শতাংশ হার্ডওয়ার থেকে আসে। আর বাকি ১০ শতাংশ রেভিনিউ আসে সফটওয়্যার থেকে।

অর্থসূচক: সফটওয়্যারে আপনাদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে কী?

রফিকুল আনোয়ার: অবশ্যই আছে। আমরা এটি নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবছি।

অর্থসূচক: আইসিটি নিয়ে কাজ করছেন। এখানে কোন ধরনের চ্যালেঞ্জ আছে কী?

রফিকুল আনোয়ার: সত্যি কথা হলো, আমরা এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যা দেখছি না। সরকার দীর্ঘদিন ধরে এ খাতকে সহযোগিতা দিয়ে আসছে। আমদানি পর্যায়ে খুব নগণ্য শুল্ক দিতে হয়। এই মুহূর্তে নতুন কিছু চাওয়ার নেই। তবে দেশ এবং দেশের ডিজিটালাইজেশনের স্বার্থে যাতে বর্তমান সুবিধা চালু রাখে সেই অনুরোধ জানাই।

অর্থসূচক: পুঁজিবাজারে আসার কোনো পরিকল্পনা কী আপনাদের আছে?

রফিকুল আনোয়ার: হ্যাঁ, আগামীতে আমরা পুঁজিবাজারে আসতে আগ্রহী। এ বিষয়ে আমরা ইতোমধ্যে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছি। আমাদের কোম্পানির যে প্রবৃদ্ধি তার সঙ্গে আমরা সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে চাই। আমরা আইসিটি পণ্যের বাজারে ১ থেকে ৩ নাম্বারে অবস্থান করি। আইপিওর পরে সব সময়ের জন্য এক নাম্বারে উন্নীত হতে চাই আমরা।

এরপর দেশের উভয় স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত করতে চাই। পুঁজিবাজারে আইটি খাতের ৭টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত আছে। এর মধ্যে কয়েকটি কোম্পানি ভালো করছে। তবে আইটি খাতে গ্লোবাল ব্র্যান্ডের মতো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি। আমরা যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন নিয়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারি, তবে গ্লোবাল ব্র্যান্ড হবে নাম্বার ওয়ান কোম্পানি। আমাদের যে ব্যবসার গতিপ্রকৃতি, টার্নওভার কিংবা আমাদের পোর্টফোলিও তার ধারে কাছেও কেউ নেই। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আমাদের পুঁজিবাজারে দেখতে পাবেন।

rafiqul-anwar4
 

অর্থসূচক: পুঁজিবাজারে আইটি কোম্পানিগুলোর অবস্থা তেমন ভালো না। বিশ্বের অন্য দেশে এর অবস্থা কেমন?

রফিকুল আনোয়ার: মাক্রোসফট, ইনটেল, ইফোসিস, টাটা, রিলায়েন্স, ডেল, এসপি এমনকি গুগল, ফেসবুকের শেয়ার বিশ্বের প্রধান পুঁজিবাজারগুলো ডমিনেট করছে। নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ, নাসডাক, লন্ডন, হংকং এসব বাজারে কোনো আইটি কোম্পানির শেয়ার লেনদেন শুরু হলে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ওই দেশের স্টক এক্সচেঞ্জের আইটি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আমাদের দেশের আইটি কোম্পানিগুলোর মধ্যে আকাশ আর পাতাল পার্থক্য। তবে হ্যাঁ আমি ঢালাওভাবে সবার কথা বলছি না।

গ্লোবাল ব্র্যান্ড যদি পুঁজিবাজারে আসে, তাহলে এটি একটি সম্মানজনক দামে থাকবে বলে আমি মনে করি। আমাদের স্টক এক্সচেঞ্জের আইটি খাতের কোম্পানিগুলোর সবগুলো কিন্তু সত্যিকার আইটি কোম্পানি নয়; কিছু আছে আইএসপি কোম্পানি। আইএসপির অবস্থা কী- এটি কম বেশি সবই আমরা জানি। এখানে যদি আইটি কোম্পানির কথা বলি তাহলে ড্যাফোডিল, আইটিসিএল, আমরা টেকনোলজি এগুলো হলো আইটি কোম্পানি। আমরা শুনছি এরা ভালো করছে। কারণ এরা সলিউশান কেন্দ্রীক কিছু কাজ করে।

আমাদের এখানে আইটি কোম্পানিগুলোর আন্ডার প্রাইসে রয়েছে। এগুলোর দাম ২০ বা ৩০ বা ৪০ টাকা থাকার কথা না। আমরা যদি ফেসবুকের কথা বলি, দেখবো শেয়ারের দাম ১৩২ ডলার। গুগলের শেয়ারের দাম ৮২৮ ডলার। ফেসবুকের বাজার মূলধন ৩৮৩ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার। বিশ্বের সব বড় বড় স্টক এক্সচেঞ্জে আইটি বা আইসিটি কোম্পানিগুলোর মূল্যায়ন থাকে অনেক ভালো। ভারতের টাটা, ইনফোসিসের দিকে দেখলেও এটি বুঝা যায়। কিন্তু আমাদের দেশে এই চিত্র ভিন্ন।

আমি বলতে চাই, আমাদে দেশে আইটি বা আইসিটির অনেক বড় বড় কোম্পানি বাজারে আসা উচিৎ। মানুষ তখন বুঝবে আইসিটি কোম্পানি কী? আইটিতে বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনা আছে। আগামী ৫ বছর পর এখাতের অন্য রকম চেহারা দেখা যাবে। এখানে হাতে গোনা কিছু লোক কাজ করছে। আগামী পাঁচ বছরে এই খাতে ২০ লাখ লোক কাজ করবে। এখন সফটওয়্যার খাতে আমাদের রপ্তানি আয় প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার। একটা সময় এ খাতের আয় ৩০ হাজার কোটি ডলার ছাড়াবে। ধীরে ধীরে আমরা সে দিকে যাচ্ছি। এখানে প্রফিট মার্জিন অনেক বেশি। এ দেশে শ্রমের মজুরি কম, তরুণ ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠী আছে। এসব কারণে আইসিটি এতোটা সম্ভাবনাময়। আমার মতে আইটি খাতে আরও নজর দেওয়া উচিৎ।

Comments

Your Name:

Your Email:

Your Comment: Note: HTML is not translated!

Enter the code in the box below: